বাঙ্গালির ঘরে ঘরে আনাচার--মাইক্রো স্টোরিস - অধ্যায় ১
বাঙ্গালির ঘরে ঘরে আনাচার |
এক
সেদিন সন্ধ্যের সময় , অংকের টিউশন থেকে ফেরার পর , বাড়িতে সবে ঢুকছি , দেখি বাবা একটা সুটকেস নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে আর বাড়ির সামনে একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে । বাবাকে জিজ্ঞেস করতে বললো , অফিস থেকে আর্জেন্ট একটা ফোন এসেছিল, বাবাকে চার পাঁচ দিনের জন্য নাকি পুনা যেতে হবে । অফিস থেকেই ফ্লাইট বুকিং করে দিয়েছে, রাতের দিকে ফ্লাইট ।
আমি টুটুন , ক্লাস সেভেনে পড়ি , সপ্তাহে দু দিন পাশের পাড়ায় একজন অংকের স্যারের কাছে টিউশন নিতে যাই । সেখান থেকেই ফিরছিলাম । বাবা চলে যাওয়ার পর বাড়িতে ঢুকলাম, দেখি মা রান্না ঘরে বসে বোনকে চামচ দিয়ে তরকারি খাওয়াচ্ছে । আমাকে দেখে মা বললো তোর বাবা বেরিয়ে গেল নারে ? আমি বলি -হ্যা, এই মাত্র ট্যাক্সিতে উঠলো। মা বলে -আর একটু পরে বেরলেই তো পারতো , ফ্লাইট তো সেই মাঝরাতে, তোর বাবার আবার সব কিছু তাড়াতাড়ি । আমি মাকে বললাম -শুনলাম নাকি চার-পাঁচ দিনের জন্য যাচ্ছে বাবা । মা বলে -হ্যা, চারপাঁচ দিনের জন্য, কিন্তু এক সপ্তাহও লাগাতে পারে কাজ না মিটলে । আমি আর কথা না বাড়িয়ে বাথরুমে ঢুকে হাতে পায়ে জল দিয়ে ফ্রেস হয়ে গেলাম । তারপর জামা প্যান্ট ছেড়ে একটা পাৎলুন পরে , শুধু গায়ে, রান্না ঘরের দিকে গেলাম । মা তখনো বোনকে খাওয়াচ্ছিল । বোন এখন সবে একটু ঝাল খেতে শিখেছে বলে মা এখন সন্ধের পর তরকারী রান্না হলে মাঝে মাঝে বোনকে দেয় ।
আমি রান্না ঘরে ঢুকতেই বোন আমার দিকে চেয়ে আদো আদো গলায় বলে "দাদান , তুমি খাবে টরকারী? বোনের মুখের আদো আদো কথা শুনতে বেশ ভাল লাগে । আমি বোনকে বললাম "না রে তুই এখন খা , আমি পরে খাব" । বোন খুশি হয়ে সদ্য বেরোনো ফুটি ফুটি দাঁত দিয়ে তরকারির আলু চেবাতে ব্যস্ত হয়ে পরলো । আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম , মা তো দেখছি এক হাতে বোনকে খাওয়াচ্ছে আর অন্য হাতে গ্যাস ওভেনে বসানো মাছের ঝোলে খুন্তি নাড়ছে । আমাকে রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মা বলে -কিরে চা টা কিছু খাবি । আমি বলি -তুমি চা কি বসাচ্ছ ? মা বলে -হ্যাঁ তোর দাদা খাবে । আমি বলি -হ্যাঁ তাহলে আমিও খাব এক কাপ ।
আমার দাদা বুকুন গত কালই কদিনের ছুটিতে বাড়ি এসেছে, দাদা ইঞ্জিনিয়ারিং পরে, ফার্স্ট ইয়ার , কোলকাতায় কলেজের হোস্টেলেই থাকে । একটা সেমিস্টারের পর ছুটিতে বাড়ি এসেছে । আমি বলি - মা তা হলে চা হলে ডেকো , আমি একটু ছাতে যাচ্ছি । আমি রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে ছাতের দিকে যাব বলে বেরোচ্ছি , হটাৎ মনে পরে গেল যে দাদা লেবু চা খায় , কিন্তু আমি দুধ চা ভালবাসি , ভাবলাম মাকে একবার মনে করিয়ে দি যে আমাকে দুধ চা দিতে , দাদা আর মা লেবু চা খায় তো খাক, আমার লেবু চা একদম ভাল লাগেনা, ভীষণ টক টক লাগে । ছাতের সিঁড়িতে না উঠে আবার রান্না ঘরের দিকে এগোচ্ছি , এমন সময় রান্না ঘর থেকে দাদার গলা ভেঁসে এল । দাদা মনে হয় চা খাবার জন্য মাকে তাগাদা দিতে এসেছে ।
দাদা একটু নিচু স্বরে মাকে বলে -বাবা বেরোলো না ? মা বলে -হ্যাঁ এই তো পনের মিনিট আগে গেল । একটু চুপ থাকার পর দাদা বলে - মা আজ রাতে হবে তো? মা রান্নায় ব্যস্ত ছিল বলে জিজ্ঞেস করে -কি ? দাদা আরো একটু স্বর নিচু করে বলে -ঐটা ? মা দাদার দিকে একবার আড় চোখে তাকিয়েই বলে , -না, আজ মনে হয় হবে না । কাল দেখবো । দাদা বলে -কেন মা? আজ হলে অসুবিধে কি , বাবা তো নেই ? মা চামচে দিয়ে বোনের মুখে তরকারির আলু ঢুকিয়ে দিতে দিতে বলে - তুই তো এখন থাকবি এক সপ্তাহ, অত তারাঘুড়ো কিসের তোর? দাদা বলে -কত দিন পর বাড়ি এলাম , বাবাও নেই আর তুমি বলছো আজ হবেনা, আমার কিন্তু আজ খুব ইচ্ছে করছে ওটা করতে । কেন তোমার ইচ্ছে করছে না করতে? মা কোন উত্তর দেয়না । দাদা বলে - কি হল বল? মা গ্যাস ওভেনের সুইচটা একটু ঘুরিয়ে ওভেনে গ্যাসের ফ্লো বাড়াতে বাড়াতে বলে - ইচ্ছে করবেনা কেন ? সকলেরই মনেই করার ইচ্ছে থাকে । কিছু আজ আর পারছিনা আমি । একে তো এই গরম, তার ওপরে দেখলি তো রিঙ্কি দুপুরে একটুও ঘুমোলোনা আর সেই সাথে আমাকে দু চোখের পাতা এক করতে দিলনা । গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত তোর বাবাও বেরোলো হটাৎ করে | ও বেরলো বলে আরো হুড়ুম দুড়ুম করে বিকেলেই রান্না বসাতে হল , সেই সাথে ওর সুটকেস গোছানো, রিঙ্কিকে সামলান , একা হাতে আমি পারি বল ? সকাল থেকেই তো খাটছি তোদের জন্য । আজ আর শরীর দেবেনা আমার । দাদা বলে -তাহলে কালকে হবে তো? মা বলে -হুম দেখি, শরীর ভাল থাকলে পরে বলবো তোকে ।
ওদের চাপা স্বরে এই সব কথাবাত্রা শুনে কিরকম যেন একটু লাগলো । কিসের কথা দাদা বলছে বুঝতে না পারলেও আমি আর রান্নাঘরের দিকে গেলাম না , সোজা ছাতে চলে গেলাম ।
( চলবে )