গোধূলি আলো'র গল্পগুচ্ছ - অধ্যায় ১১০
** মা যখন বৌ **
সেলিনা রহমানের পুরো জীবনটাই দুঃখ-কষ্টে ভরা। কিন্তু বর্তমানে যে কষ্ট তিনি ভোগ করছেন তার সাথে আগের কোনো কষ্টের তুলনা চলে না। এই কষ্ট একেবারেই অসহনীয়। কারণ আগের সব কষ্টের পেছনে একটা সান্ত্বনা ছিল যে, ছেলে বড় হয়ে আমার সব কষ্ট উসুল করে দেবে। কিন্তু এখন সারা জীবনের সেই সান্ত্বনাটাই মিথ্যে হয়ে গেছে। ছেলে চাকরি পেয়েই বৌ ঘরে নিয়ে এসেছে। তাও মেয়েটির পরিবারের অমতে, বাড়ি থেকে এক কাপড়ে পালিয়ে এসে। তবু না হয় মেনে নেয়া গেলো। কিন্তু বৌ পেয়ে ছেলে যে মাকে একেবারেই ভুলে গেছে, এটি যেনো মানতেই পারছেন না সেলিনা। মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছেন না আবার সইতেও পারছেন না।
বিয়ে হয়েছিল মাত্র 17 বছর বয়সে, উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে পড়বার সময়ে। স্বামী ছিলেন বড় চাকুরিজীবী, বয়সে তার চেয়ে 15 বছরের বড়। নিজের পরিবারের সাথে স্বামী আরশাদ রহমানের সম্পর্ক ভালো ছিল না তাই বিয়ের কিছুদিন পরেই আলাদা থাকতে লাগলেন স্বামী স্ত্রী মিলে। ভালোই কেটে যাচ্ছিল। টুকটাক মনোমালিন্য হলেও বড় ধরণের কোনো ঝামেলা হয় নি কখনো স্বামী স্ত্রীর ভেতর। বিয়ের এক বছর পরেই কোল জুড়ে এলো ছেলে আবির। ছেলেকে নিয়ে বাবা মায়ের দিন যখন অনাবিল আনন্দে কেটে যাচ্ছিল তখনই হুট করে আরশাদের ক্যান্সার ধরা পড়ে। কী করবে, কোথায় যাবে কিছুই কূলকিনারা পাচ্ছিল না সেলিনা। আরশাদের আপন মা বেঁচে ছিল না তাই বাবার সাথে সম্পর্কটাও ভালো ছিল না। ভাইদের সাথেও ব্যাপক দূরত্ব। দুঃসময়ে কাউকে পাশে দাঁড়ানোর আহবান করতে তাই নারাজ আরশাদ। সংসারের হাল যে সেলিনাকেই ধরতে হবে সেটি বুঝতে পারলো সে। কিন্তু ঘরে অসুস্থ স্বামী, নাবালক বাচ্চা রেখে কীভাবে, কী করবে সে? অনেক ভেবে চিন্তে বাবার বাড়িতেই উঠলো এসে সেলিনা। ইন্টারমিডিয়েট কোনো রকমে শেষ করেছিল সে। একটা অফিসে রিসিপশনিস্টের জব মিলে গেলো। স্বামী, ছেলেকে মায়ের জিম্মায় রেখে কাজ শুরু করলো সে। এক বছরের মাথায় স্বামী যখন মারা গেলো তখন প্রচন্ড কষ্টের ভেতরেও এই ভেবে সুখ হলো যে, তার দায়িত্বের বোঝা একটু কমলো। এরপর শুধু ছেলেকে নিয়েই বেঁচে থাকা। বাবা মারা গেলেন, তার কয়েক বছর পরে মাও মারা গেলেন। সেলিনার কোনো ভাই ছিল না। দুই বোনই স্বামীসহ দেশের বাইরে থাকতেন। বাবার বাড়িতে তাদের অধিকার তারা পুরোপুরি ছেড়ে দিলেন সেলিনাকে। এরপর থেকে ছেলেকে নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছিলেন সেলিনা সমাজের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে তার সব দুঃখ মোচন করে দেবে। কিন্তু তা আর হলো কই? মনের দুঃখ শেয়ার করবার মতোও কেউ নেই। তবে বহুদিন পর তার শৈশবের এক বন্ধু যখন বাড়িতে এলো তখন কথায় কথায় মনের সব কিছু বেরিয়ে এলো সেলিনার। সব শুনে বান্ধবী আকলিমা যা বললো তা শুনে সেলিনার চক্ষু চড়কগাছ। আকলিমা হেঁয়ালি করে বললো, যে আকর্ষণে ছেলে দূরে সরে গেছে সেই আকর্ষণ দিয়েই তাকে আবার কাছে টেনে নে।
সেলিনা অবাক হয়ে বললো, মানে কী?
আকলিমা এবার চোখ টিপে বললো, বৌ পেয়ে ছেলে যদি মাকে ভুলে যায় তাহলে মায়ের উচিত ছেলের দ্বিতীয় বৌ হয়ে যাওয়া।
সেলিনা যেনো আকাশ থেকে পড়লো। চোখ বড় বড় করে বললো, এটা কীভাবে সম্ভব?
আকলিমা নির্লিপ্ত ভাবে বললো, সম্ভব সবই। আমার ডিভোর্সের পর তো এভাবেই আছি বেঁচে। নইলে আরেক ব্যাটাকে বিয়ে করে ছেলেকে হারাতে হতো।
সেলিনা অবাক বিস্ময়ে মাথায় হাত দিয়ে বললো, কী বলছিস এসব?