গোধূলি আলো'র গল্পগুচ্ছ - অধ্যায় ৮৩
আমি তাড়াতাড়ি করে উঠে মাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। তারপর রান্নাঘর থেকে এক বাটি পানি এনে তার মুখে ছিটাতে লাগলাম। কিন্তু কিছুতেই তার জ্ঞান ফিরলো না। অগত্যা হাল ছেড়ে দিলাম। তার পাশে শোবার আর সাহস হলো না। খাটের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে রইলাম আর সেখানেই যে কখন ঘুমিয়ে গেলাম সেটা টেরও পাই নি। সকালে যখন ঘুম ভাঙলো তখন রাতের সবকিছু মনে করতে কিছুটা সময় লাগলো। যখন সবকিছু মনে এলো তখন বিছানার দিকে তাকিয়ে সে জায়গা শূন্য দেখে চটজলদি রুম থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলাম মায়ের খোঁজে। রান্নাঘরে বাসন মাজার শব্দ শুনে সেখানে গিয়ে দেখলাম মা আপনমনে বাসন পরিষ্কার করছেন। সবকিছুই যেনো স্বাভাবিক। আমি অনেকটা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু কীভাবে তার মুখোমুখি হবো সেই চিন্তাটা গেলো না। কিন্তু সে চিন্তাও কিছুক্ষণ পর দূর হয়ে গেলো যখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই আমার ঘরে এসে সকালের নাস্তা খেতে ডাকলেন। আমিও খুব স্বাভাবিকভাবেই গেলাম এবং প্রতিদিনের মতো মা ছেলেতে মিলে নাস্তা শেষ করলাম। আমার মনের ওপর থেকে অনেক বড় একটা বোঝা নেমে গেলো।
সবকিছুই যখন স্বাভাবিক ভাবে চলতে লাগলো, ঐ রাতের ঘটনা কোনো বাজে প্রভাব ফেললো আমাদের মা ছেলের সম্পর্কের ভেতর, মনের ভেতর আর কোনো চিন্তা রইলো না তখন সে রাতের স্মৃতিগুলো আমার মনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। কিছুতেই সেগুলোকে মন থেকে সরাতে পারছিলাম না। মায়ের শরীরটা পরম আকাঙ্ক্ষিত মনে হতে লাগলো। চোখের দৃষ্টি দিয়ে শাড়ির উপর থেকেই যেনো তার শরীরটা গিলে খেতে লাগলাম প্রতিদিন। মা হয়তো বিষয়টি বুঝতে পারলেন। তাই শাড়ির উপর বড় স্কার্ফ পরা শুরু করলেন ঘরের ভেতরেই। আমার মনটা বিষিয়ে উঠলো। কী করা উচিত কিছু বুঝে উঠলাম না। যেভাবেই হোক সে রাতের বিষয়টি নিয়ে সরাসরি তার সাথে কথা বলতে হবে বলে ঠিক করলাম।
মা বিকেলে ছাদে বসে চা খান বিষয়টি আমার জানা ছিল তাই একদিন সুযোগ বুঝে ছাদে গিয়ে উপস্থিত হলাম। আমাকে দেখেই মা বললো, কীরে, আজকে ছাদে কী মনে করে? বিকেল হলেই তো বাইরে বেরিয়ে যাস।
আমি মৃদু হেসে মায়ের পাশের চেয়ারটা টেনে বসে বললাম, এমনি তোমার সাথে গল্প করতে এলাম।
মাও মুচকি হেসে বললো, যাক, ছেলেমেয়েদের তাহলে এতো দিনে আমাকে দেবার মতো সময় হলো!
আমি বললাম, হ্যা হলো। কিন্তু তুমি ইদানীং নিজেকে এভাবে গুটিয়ে রাখো কেনো?
মার হাসিমুখ মলিন হলো। মিনমিন করে বললেন, গুটিয়ে রাখি মানে?
আমি কিছুটা কঠিন স্বরেই বললাম, এই যে ঘরের ভেতর এতো বড় স্কার্ফ পরবার কী দরকার?
মা এবার রীতিমতো রেগে গিয়ে বললেন, আমি কী পরবো না পরবো সেটা কি তুমি ঠিক করে দেবে?
আমি ঘাবড়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, হ্যা দেবো। আমি তোমাকে যেভাবে দেখতে চাই সেভাবেই থাকতে হবে তোমাকে।
মা রাগী স্বরেই বললেন, কোন্ অধিকারে বলছ এ কথা?
আমি কিছু সময় নীরব থেকে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, তোমার অজ্ঞান হবার সেই রাতে যা ঘটেছিল তার অধিকারে।
আমার জবাব শুনে মার মুখ একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। এমন কিছুর জন্য যেনো সে একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না। তৎক্ষণাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না। এসব কথা আর কোনোদিন বোলো না। দোহাই তোমার। আর কোনোদিন না।
বলেই তিনি সেখান থেকে ছুটে নিচে নেমে গেলেন। আর আমি অবাক দৃষ্টিতে তার প্রস্থান পথে তাকিয়ে রইলাম।