মা-ছেলের ভালবাসার ঘর - অধ্যায় ১
আপডেট-১
আমার নাম মোহন। আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। যখন আমার মার বয়স ১৬ বছর এবং আমার বাবা বয়স ২৭ বছর তখন আমার জন্ম হয়। আমার বাবা একটা কেমিক্যাল কারখানায় কাজ করতো। বাবার আয় বেশি না হওয়ায় আমরা একটা ছোট ফ্লাটে থাকতাম; যেখানে ১টা বেডরুম, ১টা রান্না ঘর, ১টা বসার ঘর আর ১টা টয়লেট ছিল।
আমার মা সুজাতা আমার বাবা কে বিয়ে করেছিল যখন মায়ের বয়স মাত্র ১৫ বছর এবং পরের বছরেই আমার জন্ম হয়। মা তখনো পড়াশোনা করছিলো। আর আমার জন্মের ৩ বছর পরে সে ডিগ্রি পাস করে। আমিও মায়ের মতো পড়ালেখায় ভালো ছিলাম। আমার মা আমাকে বাড়িতে পড়াতো। মা আমার পড়ালেখা নিয়ে খুবই সতর্ক ছিল । তাই আমি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। আমি মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ালেখা করি।
এখন আমি আমার বাড়ির সম্বন্ধে কিছু বলি। আমি যেমনটি বলেছি যে আমরা একটা ছোট ফ্লাটে থাকতাম তাই আমাদের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা ছিল না। আমার ৭-৮ বছর অবধি আমরা সবাই একই ঘরে ঘুমাতাম। আমার বিছানা আমার বাবা-মার বিছানা থেকে কিছুটা দূরে ছিল। আমি বড় হওয়ার সাথে সাথে বাবা-মা বাইরে বসার ঘরে ঘুমোতে শুরু করলো। প্রতিরাতে বাবা-মা বসার ঘরে একটা গদিতে ঘুমোতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে যখন আমি প্রায় ১৬-১৭ বছর বয়সি তখন অবধি তারা এইভাবেই ঘুমোতো। আমি লক্ষ্য করতাম বাবা-মা বিছানায় সেরকম কোনো কিছু করতেন না যেটা বৈবাহিক জীবনে প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রী করে থাকে। তখন আমি ভাবতাম ব্যাপারটা কী। আমি তাদের এব্যাপারটা দেখে ভয় পেয়েছিলাম। কারণ আমার মনে হতে লাগলো যে বাবা-মার সম্পর্ক হয়তো খারাপ হয়ে গেছে এবং তারা হয়তো বিবাহবিচ্ছেদ করবে । এমনকি আমার এও সন্দেহ হয়েছিল যে আমার বাবা অন্য কোনও মহিলাকে নিয়ে চলে যাবে। ভাগ্যক্রমে এই ধরণের কিছুই ঘটেনি। ইতিমধ্যে আমার মা কলেজ শিক্ষক হিসাবে চাকরি নেয় এবং দ্রুতই কলেজে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে সব ঠিকঠাক চলছিল না বাড়িতে। কারণ আমি লক্ষ্য করেছি যে প্রতিদিন কাজ শেষে বাবা খুব বিবর্ণ মুখ নিয়ে বাড়িতে আসতেন এবং তিনি ক্লান্ত হয়ে থাকতেন। তাই একবার আমি বাবাকে বললাম যেন সে তার শরীরের চেকআপ করান কিন্তু বাবা সেটা এড়িয়ে গেলেন। একদিন মাঝ রাতে বাবার কারখানা থেকে একটি ফোন পেলাম যে বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই খবর শুনে মা কাঁদতে শুরু করলো; আমিও কান্নায় ভেঙে পড়লাম। আমি এখন কী করব বুঝতে পারছিলাম না। মা আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলো এবং আমি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। মধ্যরাতে কোন গাড়ি পাওয়া যায়নি, তাই আমরা পরের দিন ভোরে বাবাকে দেখতে যাই। আমরা দেখা করার সাথে সাথে বাবার চোখ মুখ কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। আমরা দুজনেই বাবাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম যে তাঁর কি হয়েছে? বাবা কিছুই বলছিলো না।
একজন অল্প বয়স্ক ডাক্তার বাবাকে পরীক্ষা করে এবং রক্তের রিপোর্টগুলি আমার হাতে দিয়ে বললেন।
ডাক্তার: এই রিপোর্টটা দেখুন! কেমিক্যাল কারখানায় কাজ করে আপনার বাবার শরীরে বিষাক্ত রাসায়নিক ঢুকে গেছে যেটা ওনার রক্তের সাথে মিশে গেছে। আরো আগে আপনাদের আসা উচিত ছিল কারণ আপনার বাবার অনেক অঙ্গ খারাপ হয়ে গেছে তাই এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
একথা শুনে আমি আর মা খুব ভয় পেয়ে গেলাম এবং বুঝতে পারছিলাম না কি করবো আমরা! বাবার কারখানার একজন উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন হাসপাতালে। তিনি আমাদের বললেন।
অফিসার: আপনারা কারখানা থেকে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন এবং আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে আপনারা সেটা পেয়েও যাবেন।
অফিসারের সাথে কথা বলে আমরা বাবার রুমে গেলাম এবং দেখলাম বাবা শুয়ে আছে। আমাদের দেখে বাবা বলল।
বাবা: ডাক্তার কি বললো?
আমি: তোমার রক্তে কিছু সমস্যা আছে তবে তুমি খুব দ্রুত সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে।
বাবা যেন কিছু একটা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাকে হাসপাতালেই থাকতে হবে তাই সে আমাকে কাছে ডেকে বললেন।
বাবা: দেখ মোহন! আমি বুঝতে পারছি যে আমার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে! তবে আমি এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। আমি তোকে আর তোর মাকে নিয়ে চিন্তিত।
বাবার একথা শুনে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। মাও কাঁদছিলো। বাবা আরও বললো।
বাবা: আমি তোর কাছ থেকে দুটি প্রতিশ্রুতি চাই।
আমি: বাবা কি প্রতিশ্রুতি চাও আমার কাছে থেকে?
বাবা: তুই তোর পড়ালেখা শেষ করিস আর আমার মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করবি না।
আমি: আর অন্যটি?
বাবা: আমি চাই তুই তোর মায়ের দেখাশোনা করবি এবং কখনই তোর মাকে একা রেখে কোথাও যাবি না।
আমি: তুমি আমাকে না বললেও আমি এসব করতাম। আমি বাবাকে একথা বলে আশ্বাস দিলাম।