নিষিদ্ধ শিহরণ - অধ্যায় ৪
তৃতীয় পর্ব
নাস্তা সেরে আরও টুকটাক আম্মুকে সাহায্য করে ঘরের বাইরে পা ফেললাম গন্তব্য পুরাতন বাড়ি। ষোড়শী আমাদের পুরাণ বাড়ির বাসিন্দা। আমাদের নতুন বাড়ি থেকে পুরাণ বাড়ির দূরত্ব হাঁটা পথে ১০ মিনিটের মতো। কিন্তু বাড়ির পাশের গেট দিয়ে বের হয়ে জমির আল ধরে হাঁটলে সময় আরও কম লাগে। এ বাড়ির সীমানা থেকে ও বাড়ির সীমানা পর্যন্ত বিশাল একটা প্রান্তর। এই প্রান্তরের সিংহভাগ জমিই আমাদের। শুনেছি এখানে আমাদের আছে প্রায় একশত বিঘার মতো। এসব সম্পত্তির বেশি ভাগই আমার দাদুর হাতে গড়া। দাদুর একটা জুট মিল ছিল সেই পাকিস্তান আমলে। স্বাধীনতার আগে-পরে ওটা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর স্বাধীন দেশে অনেকগুলো ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন। শেষমেশ ২০১৭ সালে ২ পুত্র সন্তানকে সব দান করে তিনি পরপারে পাড়ি জমান।
আব্বু আর ছোট চাচা মিলে দাদুর রেখে যাওয়া একটা ছোট ব্যবসাকে টেনে অনেক দূর নিয়ে গিয়েছেন। মাঝখানে অবশ্য দাদুর পরিবারে ভাঙনের একটা সুর তাল-লয়ে বেজে উঠেছিল। পরিবারের ছোট ছেলেগুলো একটু পোংটা টাইপ হয় কি না। তিনি কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছিলেন তখনও বড় হওয়া সত্ত্বেও আমার আব্বু অবিবাহিত। দাদু ব্যাপারটাকে কোনভাবেই মেনে নেবেন না। কিন্তু শেষমেশ যা হয় আর কি, চাচার কোলে একটা ফুটফুটে পুত্র সন্তান এলো। ওর মুখ দেখে নাকি দাদার সকল রাগ পানি হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে ব্যবসার সব দায়িত্ব দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাগ করে দেন, দাদা নেন অবসর। ততদিনে আব্বুকেও বিয়ে দেয়া হয়।
২০১৮ সালের ২৯ জুন ব্যবসার কাজে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় চাচা দুনিয়ার পাঠ চুকিয়ে পরপারে পাড়ি জমান। তারপর থেকে আব্বু একাই সামলাচ্ছেন সব। চাচার স্বপ্ন অনুযায়ী তার একমাত্র ছেলেকে উচ্চতর শিক্ষার জন্য কানাডা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন চাচা নিজেই। ও শুনেছি সেখানে বিয়ে-শাদি করে সেটেল্ড। ঢাকায় আমাদের দুইটা ফ্ল্যাট আছে। একটা মিরপুরে যেটাতে আমাদের পরিবার থাকতাম, আরেকটা বাসাবোতে ওখানে চাচার পরিবার থাকতো। দুই চাচাতো বোনের বিয়ে হয়ে গেলে তাদের মাকে চাচাতো ভাই কানাডায় নিয়ে গিয়েছে। করোনার করাল থাবা যখন ইতালি থেকে বাংলাদেশে জেঁকে বসে তখন সারা বিশ্ব অচল হয়ে পড়ে। আমাদের এক্সপোর্ট পুরোপুরি বন্ধ, দেশে লক ডাউন জারি হলে কারখানাও বন্ধ হয়ে যায়। কিছু মাল বন্দরে আটকে আছে, বাকি পণ্য সব গোডাউনে পৌঁছেছে। দেনার দায় তরতর করে বেড়ে উঠছে। সারাদেশে যত মানুষ করোনায় মরেছে তার সিংহ ভাগই শহরে। তাই আব্বু সব হিসাব করে সিদ্ধান্ত নিলেন গ্রামে চলে আসার।
গেটের বাইরে পা দিয়ে আমি থমকে দাঁড়ালাম। সূর্য পূর্বের আকাশ আরোহণ করে ফেলেছে কিন্তু কুয়াশারা এখনো মরেনি। ওই দূরে হালকা কুয়াশা মৃদু বাতাসে ঘুরে ফিরছে। সূর্যের নবীন রঙিন আলোতে ওগুলোকে মনে হচ্ছিল গলিত সোনার আভা। মাত্র শীষ দিয়ে ওঠা ধানের মঞ্জুরীতে শিশিরের ফোঁটা বিন্দু বিন্দু মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করছে। আঙুলের ডগা ছোঁয়ানো মাত্রই প্রবল অভিমানে যেন জমিনে গড়িয়ে পড়ছে। আল ধরে এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে গন্তব্য অভিমুখে যাত্রা করলাম। একটু পর খেয়াল করলাম আমার পরণের চপ্পল ভারি হয়ে উঠেছে। কুয়াশা আর ধুলো ময়লা ভিজে চপ্পলের তলা কামড়ে ধরে আছে। পুরাণ বাড়িতে ঢোকার পথে একটা পেল্লাই সাইজের পুকুর আছে। বড় বাড়ির সবার গৃহস্থালি কাজকর্মে পানির উৎস এটাই।
কাঁচা ঘাটলা ব্যবহারে আমি অভ্যস্ত নই মোটেই তবুও সাবধানে কোনরকমে পা ধুয়ে নিলাম। উপরে উঠতে গিয়ে এক ভাবির সাথে দেখা। তিনি বোধহয় বাসন-কুসন পরিষ্কার করতে এসেছেন। আমাকে দেখে দারুণ উচ্ছ্বাস দেখালেন, আরে এটা কে আমাদের দিয়া মণি দেখি! কি মনে করে এ পথে? পথ ভুল করে নয় তো? সত্যি বলতে এ বাড়িতে আমার খুব একটা আসা হয়নি। কারণ, আমার জন্মই ঢাকায়। ঈদে-চাঁন্দে বা বসন্তের ছুটিতে কখনো কখনো আসলেও নতুন বাড়িতে উঠি। যখন নতুন বাড়ি ওঠেনি আমাদের তখন এখানে আসতাম কিন্তু সে আমার ৫-৭ বছর বয়সে। ফলে এবাড়ির আত্মীয়দের সাথে আমার আত্মার বন্ধন হয়নি কখনো। তবে আমার আব্বু আম্মুর কাছে ইনারা পরম আপন।
ভাবির উচ্ছ্বাসে আমার আসলেই ভালো লাগলো, বললাম না ভাবি এমনিতেই আসলাম আপনাদের দেখতে। কেমন আছেন? তিনি ঘাটে উনার মালামাল রেখে আমার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন। ছোট্ট একটা টিনের ঘর, টিনে জং ধরে ঘরের রূপ বদলে গিয়েছে। অভাব-অনটন এদের সর্বাঙ্গে স্পষ্ট ফুটে উঠলেও অন্তর ভরা ভালোবাসা-স্নেহ। ঘরের দরজায় বসে উনার শাশুড়ি মানে সম্পর্কে আমার চাচি হন তিনি বাঁশের ফালি দিয়ে পাত্র বুনছিলেন। আমাদের বৃহত্তর নোয়াখালীতে এটাকে বলা হয় ‘দোচ্চা’। তিনি ভাবির চেয়েও বেশি আন্তরিকতা প্রদর্শন করলেন। অতিথিকে আপ্যায়ন করবার মতো কিছু এদের ঘরে থাকে না সাধারণত। এরা ফল কেনে শুধুমাত্র কারো বাড়িতে বা হাসপাতালে কাউকে দেখতে গেলে ফরমালিটি স্বরূপ। নিজেরা খাওয়ার জন্য যে ফল কেনা যায় বা কিনতে হয় এ তত্ত্ব ইনাদের কূলে প্রচণ্ড হাস্যকর। নিজেদের লাগানো কোন ফল গাছ থাকলে সিজনে সেগুলো খায় তারা আর আম-কাঁঠালের সিজনে দাম যদি ২০-২৫ টাকায় নামে মধ্যবিত্ত কোন কোন পরিবার কিনে খায় তাও সবাই না। তবুও চাচি ভাবিকে দিয়ে চা করালেন সাথে দিলেন টোস্ট বিস্কুট। আমি মাত্রই ঘর থেকে নাস্তা করে এসেছি তাই খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না মোটেই। কিন্তু এদের এই ভালোবাসা আর স্নেহের সামনে সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা যায় না।
সেই ভাবিদের ঘর থেকে ২ ঘর পরে ষোড়শীদের ঘর। সাইড ওয়াল আর উপরে টিন দিয়ে মোটামুটি ছিমছাম একটা ঘর। ২ পাশে ২ টা স্টিলের দরজা খোলা। আমি প্রথম দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করি। ঘরটা বাইরে থেকে রংচটা দেখালেও ভেতরটা বেশ গোছানো। দেয়ালে নানা রকমের বাঁধানো ওয়াল সিনারিও রুচিশীলভাবেই সাজানো। কয়েকটা হাতে তৈরি জিনিসও দেখলাম ওখানে ঠাঁই পেয়েছে। প্রথমে মনে হলো এরা কেউ বাড়িতে নাই নাকি। না থাকলে দরজা খোলা থাকবে কেন? একটু পরেই পিছন দিক থেকে কয়েক জনের গলার স্বর কানে আসলো। সেটা লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম সবাই মিলে ঘরের সাথে লাগোয়া রান্নাঘরে একসাথে বসে নাস্তা করছে।
গুটি গুটি পায়ে ও ঘরের দরজায় গিয়ে বললাম এত দেরিতে নাস্তা করছেন? ওরা একযোগে আমার কণ্ঠ অনুসরণ করে তাকিয়ে যেন বোকা বনে গেলেন। আমি ওদের অবস্থা দেখে বললাম, আমি বোধহয় আপনাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছি। ষোড়শী দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বললো তা কেন আপু? আমরা বরং গরিবের ঘরে তোমার উপস্থিতিতে খুশির ছোটে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছি। এসো..। ওর আম্মু উঠে আসতে আসতে ওর বড় ভাইকে বললেন একটা চেয়ার নিয়ে আয়। ষোড়শীর ভাইয়ের নাম নিশাদ। যখন ছোট ছিলাম ২-৩ বার এ বাড়িতে আসলে ওর সাথে আমার ভালোই সম্পর্ক ছিল, একসাথে খেলতাম। আমি আর ও সম্ভবত সমবয়সীই হবো। কিন্তু বহু বছর কেটে গেছে। আমি ফলবতী হয়েছি ও-ও হয়েছে ফলবান। ফলে খানিকটা লজ্জা পেল বৈ কি!
আমি ওর মোড়া খানিক দূরে নিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছেন সবাই। চাচি বললেন এই তো মা গরিবরা যেমন থাকে। তোমার আম্মু কেমন আছে। আমি যাব যাব করে সময় করতে পারছি না। ষোড়শী জিজ্ঞেস করলো, আপু এত দূরে গিয়ে কেন বসছো? বললাম, এখন তো করোনা চলছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে না? ওর আম্মা বললেন, ওসব শহুরে অসুখ আমাদের গাঁও-গ্রামে নাই। কি আশ্চর্য এরকম একটা প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রতি এদের কি তাচ্ছিল্য। তবু বললাম, আমি তো শহর থেকেই এসেছি, আপনাদের মধ্যে সংক্রমিত হবার আশঙ্কা আছে চাচি। আরে কিচ্ছু হবে না, তুমি এদিকে আসো তো।
একটা বাটি নিয়ে ওটাতে আলু ভাজি মতো কিছু একটা নিচ্ছিলেন কড়াই থেকে। বুঝলাম আমার জন্য বন্দোবস্ত হচ্ছে। তাড়াতাড়ি বললাম চাচি আমি এইমাত্র বাড়ি থেকে খেয়ে বেরিয়েছি তার উপর রোজি ভাবি পথে পেয়ে ইচ্ছেমতো খাইয়ে দিয়েছে। এখন পেটে একটা দানাও যাবারও জায়গা অবশিষ্ট নেই। প্লিজ উতলা হবেন না। উনি বললেন, তা কি করে হয় মা.. আমার ঘর থেকে তুমি শুধু মুখে যাবে তাও আমরা যখন খাচ্ছি। আচ্ছা আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি অন্য কোনদিন এসে খাবো, আজ না। আমি এমনিতে হাঁটতে বেরিয়েছি এখন উঠবো।
আমার যা দেখার তা দেখা হয়ে গিয়েছে। আমার ভাইয়ার সাথে দারুণ মানাবে। কিন্তু যতই সুন্দরী হোক গাঁইয়া একটা ফ্লেভার থেকেই যায়, এটাই একটু কেমন! অন্যথায়, লম্বা গড়নের মেয়ে, দুধ সাদা গায়ের বরণ, লম্বা চুলের বেণী। বুকের শেপটা দারুণ! গলা পেঁছিয়ে একটা ওড়না দেয়া আছে বুকের উপরে কিন্তু ওটা গলা ঢেকে রেখেছে। যেটা ঢাকার জন্য ওটা দেয়া সেটা একদম উম্মুক্ত। খুব ভুল না করলে এই বয়সেই দুধের সাইজ ৩৪ হবে। কে জানে ওগুলো এমনি এমনি এতবড় নাকি কোন প্রকৌশলীর যত্নে একটু একটু করে গড়ে উঠেছে। নিতম্ব সুগঠিত, বুঝলাম আমার ভাই কি দেখে মাতাল হতে পারে। যদিও আমি জানি না সম্পর্কটা এখন পর্যন্ত কোন পর্যায়ে। আসি বলে সবাইকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে ষোড়শীকে আমাদের বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। চাচি কয়েক হাজারবার বলে ছেড়েছেন যেন আবার আসি।
যে পথে এসেছি সেই পথ ধরে ফিরতে উদ্যত হলাম। সাথে সাথে পুরাণ বাড়ির সীমা পর্যন্ত ষোড়শী আসলো। রোদ তেঁতে উঠেছে, গায়ে লাগতেই হালকা একটু উষ্ণ ছোঁয়া দিয়ে গেল। এখান থেকে দূরে ওই আমাদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। লোকালয়ের কোলাহল থেকে দূরে নিভৃতে থাকার জন্য পুরাণ বাড়ির আশ-পাশ ছেড়ে ওখানে বাড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দাদু।
বাড়িতে ফিরে দেখি আম্মু শাক কুটছেন। কাছে গিয়ে বললাম আব্বু আর ভাইয়া কই? আম্মু পাল্টা প্রশ্ন করলেন তুই গেছিলি কই? কই আর যাব পুরাণ বাড়ি থেকে একটু ঘুরে এলাম। ভাইয়া ঘরে নাই? আম্মু উত্তরে বললেন না ও বাইরে গেছে। আম্মুকে তার কাজে কিছু কিছু সহায়তা করবার চেষ্টা করি। বেলা গড়ায় সন্ধ্যা নামে ফোন ঘেঁটে চলে যায় রাতের অর্ধেক। এভাবেই দিন কাটে।
৪-৫ দিন পর হবে হয়তো একদিন রাত ১২ টার দিকে ফোন পেয়ে আব্বু ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আম্মুকে জিগাইলাম কার ফোন ছিল, কি হয়েছে? আম্মুও জানে না কিছু। আমরা ২ ভাই বোন যার যার ঘরে ঘুমাতে চলে গেলাম। সকালে নাস্তার টেবিলে রাতের ফোনের বিষয়টা আব্বু নিজেই তুললেন।
উনার চাচা গফুর বাজার থেকে প্রতিদিনের মতো ফিরছিলেন। বাজার থেকে আমাদের গ্রামে ফিরতে মাঝখানে একটা ছোট ব্রীজ আছে। উনি ব্রীজের কাছে আসলে ৩-৪ জন মুখ বান্ধা যুবক নাকি তাকে ব্রীজের তলা থেকে উঠে এসে ঘিরে ধরে ফোন আর টাকা পয়সা নিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় উনার সাইকেল সহ উনাকে খালে ফেলে দিয়ে গেছে। ভাগ্যক্রমে তেমন কোন ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি, টাকাও বিশেষ ছিল না। ঐ হাজার ২ হাজারের মতো হবে। আম্মু বললো কাউকে চিনে নাই? আব্বু বললো না কাকা কাউকে চিনতে পারে নাই তবে সম্ভবত আমি একজনকে চিনেছি। আম্মু বললেন, মানে কি? তুমি তো পরে ফোন পেয়ে গেছ তুমি চিনেছ মানে? আব্বু আবার বললেন দোয়া কর, আমি যেটা সন্দেহ করছি সেটা যেন সত্যি না হয়। কথাগুলো বলতে বলতে নিপুণ সেকরার চোখে ভাইয়াকে নিরূপণ করছেন।
আম্মু ঘটনা বুঝে বললেন তুমি বাবা না শত্রু? ... কালকে সন্ধ্যার পর থেকেই ঘরে, তুমি বাইরে যেতে ওরে দেখে যাওনি? নেতারা সবসময় অঘটনের স্থান থেকে দূরে থেকে নিজেকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখারই চেষ্টা করে, কাজ তো করে চেলারা। ভাইয়া এবার নীরবতা ভেঙে বলে উঠলো, দেখ আব্বু হুদাই সি আই ডি’র মতো গন্ধ শুঁকা বন্ধ কর প্লিজ। ঢাকায়ও পাড়ায় কোন গণ্ডগোল হলে সেখানে তুমি আমার ইন্ধন খুঁজতে, এখানেও শুরু করে দিয়েছ। শুধু শুধু দাদাকে আমি কেন বেইজ্জত করতে যাবো? কথাগুলো বলে নাকে অভিমানের সুর বাজিয়ে খাবার রেখেই উঠে গেল।
ওর কথার রেশ ধরে এবার আম্মু বললেন, তাইতো গোবি (গফুর- সবাই গোবি নামে উনাকে চিনে বেশি) কাকার সাথে রবির কি শত্রুতা? আব্বু বলে উঠলেন, খবর তো রাখ না কিছুই। ছেলে-মেয়ে কোথায় যাচ্ছে, কি করছে কোন খবরই তো তোমার কাছে থাকে না। কথার মাঝখানে আমাকে কেন টানা, আচমকা বিব্রত হয়ে গেলাম। আম্মু আমার দিকে তাকালেন। আব্বু নিজেই আবার বলে উঠলেন, কিছুদিন আগে নাকি সন্ধ্যার সময় পুরান বাড়িতে আমাদের বাঁশ বাগানে ষোড়শীকে রবির সাথে দেখেছেন গোবি কাকা। আরও আগে ২-১ দিন ষোড়শী কলেজে যাওয়ার পথে ওর সাথে কথা বলতে দেখে, তেমন কিছু মনে করেননি তিনি। ভেবেছেন একই বাড়ির ছেলে-মেয়ে তাও তো দূরের নই। ষোড়শীর দাদা আর আমার বাবা আপন চাচাতো ভাই ছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন ব্যাপারটা। কিন্তু ভর সন্ধ্যায় নির্জন বাঁশ-বাগানে দেখার পর তিনি বিষয়টি লুকিয়ে আমাকে জানান সাবধান করবার জন্য। আর আমি এসে তুমি এবং সবাইকে বললাম। এখন তুমি বলো জীবনের ৭০ বছর উনি প্রতিদিন কয়েকবার করে সকাল-সন্ধ্যা, রাত-দুপুরে যাতায়াত করে এসেছেন কিছুই হলো না কোনদিন। আর সেদিন ওর নামে আমাকে নালিশ করিবার ৩ দিন পরেই কেন উনার সাথে এই ঘটনা ঘটবে?
আম্মু আম্মুর বুঝ পেলেন তবুও মুখে বললেন আমার ছেলে ওরকম কোনদিনও করবে না। তুমি হুদাই সন্দেহ করা বন্ধ কর তো! আব্বু আস্তে আস্তে নিজেই যেন নিজেকে শুনালেন, ও তো আমারই ছেলে সন্দেহ তো হয় রে..! আম্মু একটা প্লেটে খাবার সাজিয়ে আমার সামনে রেখে বললেন যা রবির রুমে দিয়ে আয়। বলে তিনি দ্রুত কিচেনের দিকে চলে গেলেন। আব্বু প্রথমে প্লেটের দিকে তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখেছিস তোর মা ছেলেটাকে কোথায় একটু শাসন করবে, তা না..ধ্যাত! আমি এমন একটা ভাব দেখালাম যে কে কাকে কেন শাসন করবে বা করবে না তার আমি কি জানি।
প্রকৃতপক্ষে ভাইয়া আমাদের মা-মেয়ে ২ জনেরই চোখের মণি। আব্বু বোধকরি ওকে আমাদের থেকেও বেশি ভালোবাসেন। কিন্তু পুরুষের ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয় না। ভাইয়া এই বাউন্ডলেস ভালোবাসা পেয়েই ভাউণ্ডলে হয়ে গেছে দিন দিন। ও চেয়েছে কিন্তু পায়নি এমন কোন বস্তু বা আবদার নাই। আম্মু কোনদিনও ওর উপর কঠোর হতে পারেন না। আর আব্বু কঠোর হতে চাইলেও বাধা পান আম্মুর পক্ষ থেকে। তিনি আব্বুকে সবসময়ই বলেন আমি দেখছি, আমি দেখছি বলে বলে ঠান্ডা করে দেন। আদতে দেখেন না কিছুই। আমি খাবারের থালা নিয়ে ওর রুমের দরজায় নক দিয়েছি, দরজা খোলাই ছিল তবুও ওকে সতর্ক করা আর কি। খাটে শুয়ে ফোন টিপছিল, মুখের সামনে থেকে ফোন সরিয়ে শান্তস্বরে বললো আয়। কি এনেছিস? আমি একটু অভিনয় করে বললাম ষোড়শীর হাতের হালুয়া, খাবি? ভাইয়া চোখ রাঙিয়ে বললো, তুমিও পেকে গেছ না? আমি বললাম তুই বাঁশ-বাগানের শয়তান তাড়ায়ে বেড়াবি আর আমি বললেই দোষ! ভাইয়া জিভে কামড় দিয়ে বললো--
- এসব কে বলেছে তোকে?
- কে বলেছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ তো না। কোন জাতের ভূত তাড়িয়েছিস সেটাই
মূল কথা।
- শালার বুইড়া খাটাস!
- তার মানে গোবি দাদার এই হাল তুই করেছিস?
- তোর বাপের মতো তুইও গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছিস? তোরা বাপ-মেয়ে
একটা গোয়েন্দা দোকান খুলে বসলেই পারিস।
- যাই বলিস ভাইয়া কাজটা তুই ঠিক করিসনি। হাজার হোক উনি আমাদের
দাদা হন, মুরুব্বি মানুষ!
- আমি কিছু করিনি বললাম না তোকে।
- ঠিক আছে স্বীকার করতে হবে না কিন্তু সবাই বুঝে গেছে কি থেকে কি
হয়েছে।
- সবাই বুঝেছে মানে? সবাই কারা?
- না এখনো ভয় পাওয়ার কিছু নাই। সবাই বলতে আমি, আব্বু আর আম্মু।
বাইরের কেউ না।
- বাইরের কেউ হলেই বা কি। আমি সেদিন সারা রাত ঘরেই ছিলাম।
- তোকেও বলি হারি ভাইয়া। প্রেম করলে আবার মানুষ কেমনে দেখে! তবে
ভাইয়া তোর পছন্দের তারিফ করতে হয়। ষোড়শী কিন্তু সেই..!
- বলছিস?
- হ্যাঁ। আব্বু যেদিন তোর সাথে চোটপাট করলো না? সেদিন সকালে কিন্তু
গিয়েছিলাম ওদের বাড়ি।
- কেন?
- বারে.. আমি আমার হবু ভাবিকে দেখবো না?
- কে তোর হবু ভাবি? কার কথা বলছিস? আমি কারোর সাথে প্রেম-টেম করি
না।
- কথা ঘুরাচ্ছিস? কোন লাভ নাই। আমার কাছে এখন সব জলের মতো
পরিষ্কার। শুধু একটু..
- একটু কি?
- ওমা.. একটু কি সেটা দিয়ে তুই কি করবি, তাতে তোর কি? তুইতো কারোর
সাথে প্রেম-টেম করিস না তাই না?
- ভাগ এখান থেকে।
- ঠিক আছে আমি গেলাম। খেয়ে নে।
- খাবো না, নিয়ে যা।
- কেন খাবি না? রাগ করেছিস?
- কার উপর রাগ করবো? সফি সাহেবের উপর? হা হা.. বাপের কাজ হচ্ছে ছেলের উপর চিল্লাচিল্লি করা আর ছেলের কাজ হচ্ছে বাপকে চিল্লানোর সুযোগ করে দেওয়া। চিল্লাইতে না পারলে রক্তে সুগার বেড়ে যাবে। এতে রাগারাগির কি আছে! এমনিতে খেতে ইচ্ছে করছে না তবে যদি তুই খাইয়ে দিস সেটা ভিন্ন কথা।
- বাহ! একখান আবদার বটে! বড়রা ছোটদের খাইয়ে দেয় নাকি ছোটরা
বড়দের?
- যা, খাওয়াতে হবে না।
অগত্যা ভালোবাসার দায় থেকে একটু একটু করে ওকে খাইয়ে দিলাম। বাচ্চা ছেলের মতো ফোন টিপার ফাঁকে ফাঁকে গ্রাস লুফে নিচ্ছে। আমাদের বন্ডিংটা এ পর্যন্ত গাঢ়!
পাঠক সমাজের স্বত:স্পুর্ত প্রসংশা, ক্রিটিসিজমের অপেক্ষায় ৪র্থ পর্ব...