নিষিদ্ধ শিহরণ - অধ্যায় ৫
এভাবেই দিনের পর সপ্তাহ, সপ্তাহ ঘুরে মাস পেরিয়ে যায়। করোনা তার বিষদাঁত নতুন নতুন মাত্রায় ফুটাতে থাকে মনুষ্য সভ্যতায়। একবার লকডাউন সীমিত পরিসরে খোলে, সংক্রমণ বেড়ে গেলে আবার দিয়ে দেয়। আদতে লকডাউন দেয়া হচ্ছে মানুষ যেন ঘরে থাকে। বাস্তবে সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত ছাড়া মানুষের আর কিছুই বন্ধ নাই। মানুষের বেড়ানো বন্ধ হয়নি, রাস্তায়, পাড়ার রকে আড্ডা বন্ধ হয়নি। দোকান গুলোতে ফালতু মানুষের ভিড় কমেনি। ও দিকে পাল্লা দিয়ে মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে, তবু মানুষ সচেতন নয়।
আমার সেদিনের দেওয়া দাওয়াত ষোড়শীর জন্য যেন আমাদের বাড়ির গেট পাস হয়ে গিয়েছে। সকাল-সন্ধ্যা ও সুযোগ পেলেই আসে। আম্মু খুব বিরক্ত! এমনিতেই আমাদেরক গ্রামের সবাই অহংকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। এরমধ্যে যদি কোনভাবে ওকে আসতে নিষেধ করা হয় তাহলে আর দেখতে হবে না। আমিও আম্মুকে বোঝাই “ও তোমার কি ক্ষতি করছে? আমি এখানে একা একা ভালো লাগে বলো? ও এসে একটু সংঘ দেয় এই তো”। আম্মু বললো তুই যেন কিছু জানিস না! আমি বললাম, ওসব হুদা কথা। ভাইয়া আর ষোড়শীর মধ্যে কোন সম্পর্ক নাই। থাকলে আমি তোমাকে বলতাম না। আসলে ষোড়শী আসেই ভাইয়াকে দেখার জন্য। আমার খারাপ লাগে না।
দুইটা উপযুক্ত ছেলে মেয়ে যদি একে অন্যের টানে উতলা হয় তাতে আমাদের সমাজ বা অভিভাবকরা কেন বেগড়া দিতে চান আমি জানি না। প্রেম আমার জীবনেও এসেছিল একবার তাই আমি জানি এর অনুভূতি। আশ্চর্য এক দোটানা কাজ করে আমাদের বাঙালি অভিভাবকদের মনে। তারা জানেন ছেলে হোক বা মেয়ে যৌবন তাদের শরীরে প্রবেশ করলে তারা সেই যৌবন বিনিময়ের জন্য পাগলা ঘোড়ার মতো উন্মত্ত হয়ে ওঠে। কেউ আচার আচরণে সহসা প্রকাশ করে কেউ আবার সেই বাঁধ ভাঙা জোয়ার নিজের মধ্যে চেপে রাখে কিন্তু স্রোত তো চলতেই থাকে। বাবা-মা রা এসব বুঝতে তো পারেন শুধু বোঝেন না সময়ের উপযোগ। তারা এক অলীক সময়ের অপেক্ষা করাতে থাকেন তাদের সন্তানকে। ধরা যাক, ২৫ বছরের এক যুবক কোন একটা কোম্পানীতে ২০ হাজার টাকা মাইনিতে চাকরি করে। অভিভাবকের ধারণা এটা পর্যাপ্ত নয় কারণ, তার বিয়েতে গয়না দেয়া লাগবে, মানুষজন খাওয়াতে হবে আরও অনেক খরচ। এসব খরচ তো তাকেই জোগাড় করতে হবে। এ টাকা সে কিভাবে জোগাড় করবে তার সঠিক দিশা অভিভাবকের কিন্তু নেই। ২০ হাজার টাকার স্যালারি রাতারাতি পঞ্চাশ হাজার হবে না। হয়তো ৩-৪ বছর পর পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার হবে কিন্তু তখন মুদ্রাস্ফীতি কি আজকের এখানে পড়ে থাকবে? অর্থাৎ তাদের কল্পিত প্রতিষ্ঠা কোনদিনও হবে না তবুও তারা অপেক্ষা করাতেই থাকেন।
যদি কোন মেয়ের ব্যাপারে বলি তাহলে বাঙালি মেয়েদের কত শতাংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আসলে প্রতিষ্ঠা বলতে যা বোঝায় সে রকম? তবুও বাপেদের অলীক স্বপ্ন “আমার মেয়ে পড়াশোনা করবে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে তারপর বিয়ে”। শেষমেশ কোন টাকলা প্রবাসীর হাতে বা পেট মোটা সরকারি চাকরিওয়ালার কোলে প্রতিষ্ঠিত করে দেন। মন চাক বা না, তার ঘর করতে বাধ্য হয়। ইচ্ছে হোক বা না হোক তার বিছানায় নিজের সমস্ত স্বপ্ন চোখের পানিতে বিসর্জন দিতে হয়। যৌবনের কি দারুণ অপচয়! অথচ, বিয়ে আর জীবনের প্রতিষ্ঠার সাথে কাটাকাটিটা কোথায় কেউ জানে না। কেন এই দুইয়ের সম্পর্ক বিপরীতার্থক!
আমি এমন অনেককে চিনি যারা বগ্লাহারা যৌবন আর বন্ধনহীন হৃদয়ের টানে খুব অল্প বয়সে ঘর ছেড়েছে, পালিয়ে বিয়ে করেছে। দিব্যি চলছে তো তাদের জীবন, সংসার! হ্যাঁ, তাদের কেউ কোন মন্ত্রণালয়ের সচিব হতে পারেনি। কিন্তু যারা পরিবারের চাপে প্রেম বিসর্জন দেয়, সামাজিক রীতির কাছে যৌবন বন্ধক দেয় তারা সবাই কি সচিব হয়? কয়জন হয় মন্ত্রী? আসলে আমাদের অভিভাবকরাও জানেন কারো রিজিক কারো হাতে না, এমনকি তাদের নিজেরটাও তাদের হাতে নেই। শুধু মানতে চান না বা মানতে কষ্ট হয়।
ষোড়শী আসে যায়। বাসায় ভাইয়া থাকলে আমি অল্প-স্বল্প সুযোগ করে দেই আম্মুর ভয়ে কেঁপে মরি যদিও। দিনে দিনে ওরা আত্মহারা হতে থাকে। মুশকিল হলো আমি ওদের সুযোগ করে দেই সত্য কিন্তু ওরা এখনো আমার কাছে ধরা দিতে প্রস্তুত নয়। কোনভাবেই দুইজনের কেউই স্বীকার করে না যে তারা কোন গভীর সম্পর্কে আছে। খুব সম্ভবত মাস দুয়েক পরে লকডাউন কিছুটা শিথিল করলে আম্মু নানার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। সকাল থেকে ভাইয়াও উধাও। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয় ঘরে আমি একা। গৃহস্থালী কাজকর্ম সেরে একটা ঘুম দিলাম। সারা রাত আমার ঘুম হোক আর না হোক, দুপুরের পর ঘুম আসবেই। ঘুম ভাঙলে কেমন অস্থির অস্থির লাগে। ভাইয়াকে ফোন দেই, ধরে না। সকাল থেকে এ নিয়ে তিনবার কল দিয়েছি। কি করি কি করি করতে করতে মনে হলো একবার পুরাণ বাড়িতে যাওয়া যাক।
যেতে যেতে অস্থির মন হঠাৎ-ই দুষ্টুমির একটা পরিকল্পনা করে। ফাঁকা বাড়িতে এমনিতেও ভালো লাগছে না। বরং আসার সময় ষোড়শীকে নিয়ে আসা যায় কি না চেষ্টা করলে কেমন হয়! ও বাড়িতে আমার পা ফেলা মানে ওদের কারও কাছে দেবী এসেছি, কারও কাছে ভয়ংকর অহংকারী এক মেয়ে কারও কাছে আবার মাঝামাঝি। সত্যি বলতে আমি কোনটাাই না। যারা আমাকে দেবীর মতো মনে করেন, সেই রোজি ভাবি আর তার পরিবার। এরকম আরও দুই-এক পরিবার আছে যাদের সাথে আমার ইতিপূর্বে ভাবের দেনা-লেনা হয়েছে, তারা আমাকে চেনেন। অহংকারী যারা ভাবেন, তাদের সাথে আমার কোনদিন কথাই হয়নি। যেহেতু ওভাবে তাদের চিনিও না আমি যেচে গিয়ে কি কথা বলবো? তাই আমি অহংকারী।
যাইহোক, সবার মধ্যে রোজি ভাবির সাথেই আমার জমে ভালো। চলে আসার সময় হলে একটু ভয় নিয়ে ষোড়শীর আম্মার কাছে গিয়ে খুব বিনয়ের সাথে বললাম, চাচি সকালে আম্মু নানার বাড়ি চলে গেছে। সকাল থেকে ভাইয়াও নাই। ও কখন আসবে না আসবে আদৌ আসবে কি না তারও ঠিক নেই। আমার একা একা থাকতে কেমন কেমন করছে। ষোড়শীকে দিবেন আজকে রাতটা আমার সাথে থাকবে? তিনি খানিকটা ইতস্তত করে বললেন, কেউ যেহেতু নাই ঘরে তুমিই বরং ষোড়শীর কাছে থেকে যাও না। এই বাক্যের পর আমার কি কোন কথা বলার থাকে? উনি মনোভাব ধরতে পেরে বললেন, বড় ঘরের ঝি বুঝি একটি রাতও গরিবের ঘরে থাকা যায় না? আচ্ছা নিয়ে যাও।
ভাইয়া আর ষোড়শীর প্রেমের গুঞ্জন উনারা শুনেছেন কি না আমি জানি না। খবরটা আমাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছালে একই বাড়ির লোক উনাদের না বলার কোন কারণ নেই। তথাপি, ষোড়শীর মতো মেয়ে আমাদের বাড়ির বউ হবার সুযোগ এলে তার মায়ের প্রচ্ছন্ন সম্মতি অবাস্তব নয়। ষোড়শীর খুশি যেন আর ধরে না। অথচ, সবার সামনে প্রকাশও করতে পারছে না। ও আমার আগে আগে পা ফেলে চলতে থাকে। যদি মায়ের হঠাৎ মতিভ্রম হয়ে যায়, যদি যেতে নিষেধ করে দেয়, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মায়ের নাগালের বাইরে চলে যেতে চায়। কিছুটা দূরে চলে এসে হাঁটার গতি কমায়। আপু রবি ভাই বাড়িতে নাই বললেন কোথায় গেছে? উত্তরে বললাম, জানি না রে। কেন তুই জানিস না? ও বললো, ভাই আপনার আমি কেমনে জানমু? আমার ভাই, তোর কিছু লাগে না বলে ওর মাথায় মৃদু আঘাত করলাম একটা। ও হেসে উত্তর দেয়, লাগে তো, আপনার ভাই আমারও রবি ভাই। দু’জনে বেদম হাসলাম অনেকটা!
দু’জনে হাসি-ঠাট্টায় সময় বেশ কাটছিল সেদিন। কোন শাসন বারণ নেই আজ তাই বিন্দাস! দু’জনে পরামর্শ করে বেশ রান্না-বান্না করলাম। ষোড়শী কোথায় যেন নিভে আছে। হাসি ঠাট্টা সবই হচ্ছে কিন্তু একটু পর পর দরজায় তাকানো আমার নজর এড়ায় না। রাস্তায় বাইকের আওয়াজ শুনলে কান খাড়া করে দেয়, বাইকটা বুঝি এই দরজায় এসে থামল। কিন্তু আওয়াজটা দূরে যেতে যেতে যখন হাওয়ায় মিলিয়ে যায় ও খানিক হতাশ হয়। বললাম, এত উদাস হবার কিচ্ছু নেই সময় মতো চলে আসবে। ভাইয়া প্রায়ই এমনটা করে, বিশেষত ঢাকা থেকে এসে ফেনীর রাজনীতিতে যুক্ত হবার পর থেকে।
এখানে ওর পদ-টদ না থাকলেও ঢাকার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে ভালোই অগ্রাধিকার পেয়েছে যা বুঝছি। সুতরাং নানা প্রোগ্রাম থাকে ওর। লকডাউন যে গেছে সেটা বাংলাদেশ সরকার জানে, আমার ভাই সোনা কোন একটা দিনের জন্যও ঘরে আবদ্ধ থাকেনি। প্রথম প্রথম খুব দুঃশ্চিন্তা হলেও আমরা মা-মেয়ে এখন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত বাড়তে থাকে, ষোড়শীর মনও যেন বাঁধ হারাতে থাকে। কিছুক্ষণ পরপরই কি যেন বলতে চায়, কথা গলায় এসে আটকে যায়। আমি বুঝতে পারি ও কি বলতে চায়। ওকে উদ্দেশ্য করে বলি এতই যখন চিন্তা এই নে ফোন কর। ও আমার হাত থেকে ফোন নেয় কিন্তু কল করে না। ফেসবুকে লগ ইন করে। ও আচ্ছা তাহলে এই তোমাদের যোগাযোগ মাধ্যম, আমি বলি। ষোড়শী লজ্জাবনত মুখে হেসে দেয়।
ষোড়শীর হাতে ফোন দেয়া হয়নি। মায়ের ফোন থেকে কথা বলা দুষ্কর তাই মেসেজই তাদের প্রেমের বাহন। ও ফোন হাতে করে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে রোধ করি, “যা কথা হবে আমার সামনে হবে. নো লুকোচুরি”। ষোড়শী লজ্জা পায়। ওর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলি তোর আর লজ্জাও পেতে হবে না, কথাও বলতে হবে না। আমি ভাইয়াকে ফোন দিলে সে এইতো চলে আসছি বলে রেখে দেয়। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ একটা বাইকের গর্জন সত্যি-ই এসে আমাদের দরজায় থামে।
ষোড়শীকে ধাক্কা দিয়ে বললাম “এসে গেছে তোর রবি ভাই। যা দরজা খুলে দে। ও লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে, দরজা খুলতে যায় না। এরমধ্যে কলিংবেলও বেজে উঠেছে। আমি গিয়ে দরজা খুলে দেই। চাবির রিং শাহাদা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে প্রবেশ করেন আমাদের প্রেমের মহাপুরুষ। কি রে কি করছিলি? ভাইয়া জিজ্ঞেস করে। জিজ্ঞেস করতে করতে সে ডাইনিং টেবিলের দিকে হাঁটছিল। গ্লাসে পানি ঢেলে আমার দিকে তাকায়, ততোক্ষণে ষোড়শী আমার পিছনে এসে আশ্রয় নেয়। ভাইয়া গ্লাসে ঠোঁট ঠেকিয়ে আমার দিকে তাকালে ঠিক আমার পিছনে ষোড়শীকে দেখে ভিষম খায়। সমস্ত পানি নাকে-মুখে ওঠে, ও খুক খুক কাশতে শুরু করে। আমি বললাম, এমন করছিস কেন? ষোড়শী যেন আমাদের বাড়িতে আর আসেনি, তুইও হঠাৎ আজকেই দেখছিস! কি আশ্চর্য আমি ষোড়শীকে দেখে এরকম করতে যাবো কেন? হঠাৎ আমার কাশি উঠেছে এই যা, ভাইয়া উত্তর দেয়! আমি বললাম হয়েছে হয়েছে আমি তো শিশু এখনো কিছু বুঝি না! ফ্রেশ হয়ে নে সবাই একসাথে খাব। ভাইয়া বললো আমি অলওয়েজ ফ্রেশ, তুই ভাত দে।
খাবার টেবিলে দু’জন দু’জনের দিকে কি মধুর দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল আমার চোখের আড়াল হলেই! ভাইয়া বলে ওঠে, দিয়া ষোড়শীকে কি একেবারে নিয়ে এসেছিস? নাকি... আমি বললাম আপতত ওয়ান টাইম। কলমা পড়ার বিধান তো আমার জন্য নয়, তাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আমাকে দিয়ে হচ্ছে না। খাওয়া শেষ হলে প্লেট-ঘটি-বাটি নিয়ে আমি কিচেনে চলে যাই। ষোড়শী চেয়ার ছেড়ে আমার সাথে যেতে চাইলে বলি এ কয়টাই তো, তুই আসা লাগবে না। আমার উদ্দেশ্য ছিল ওই দুজনারে একটু কথা বলবার সুযোগ করে দেওয়া। ছোট বোনের প্রেমে বড় ভাইরা এক একজন মিশা সওদাগর হলেও ভাইদের বেলায় বোনেরা এক একজন দিল-দরিয়া। ভাইয়ের প্রেমে কোন বোন বেগড়া দিয়েছে এরকম ইতিহাস খুবই নগণ্য।